সভ্যতার আলো

সভ্যতার আলো, তার লিখনী দিয়ে আরো উন্নত ও সমৃদ্ধশালী সভ্য জাতি গঠনে অনন্য ভূমিকা রাখবে

চাপ বাড়াতে একত্রে কাজ করবে কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র

 

রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত গণহত্যা ও জাতিগত নিধন বন্ধে জাতিসংঘের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সংস্থা নিরাপত্তা পরিষদ বৃহস্পতিবার কী সদ্ধিান্ত নেয়, সেদিকেই সবার দৃষ্টি।

 

প্রবল আন্তর্জাতিক চাপের মুখে নিরাপত্তা পরিষদ আজ উন্মুক্ত বিতর্কে মিলিত হচ্ছে। বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হবে। এমন সময় এ বৈঠক হচ্ছে, যখন মিয়ানমারের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের জোর দাবি উঠেছে।

মিয়ানমার সরকার ও দেশটির নিপীড়ক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ আশা করছেন সবাই। কিন্তু চীনসহ দু-একটি দেশের ব্যবসায়িক স্বার্থের কারণে এ প্রত্যাশা কতটা পূরণ হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

অন্যদিকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে চাপ তীব্রতর করতে একযোগে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র।

নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে এ নিয়ে এক মাসে তিন দফা বৈঠকে হচ্ছে। এর আগেও রোহিঙ্গা ইসু্যতে দুই দফা আলোচনা হয়েছে।

সর্বশেষ ১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দফতরে রোহিঙ্গা ইসু্যতে আলোচনা হয়েছে। এতে দীর্ঘ ৯ বছর পর নিরাপত্তা পরিষদের সব সদস্যের ঐকমত্যের ভিত্তিতে এক বিবৃতি দেয়া হয়।

বিবৃতিতে রাখাইন রাজ্যে চলমান সহিংসতায় চরম উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। তবে অনেকেই নিরাপত্তা পরিষদের সমালোচনা করছেন যে তারা গণহত্যা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে শুধু কথায় যে আর চিড়া ভিজবে না তা সবাই বুঝে গেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দেশটির বিরুদ্ধে ৪ সপ্তাহ ধরে কম কথা বলেনি। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

নিধনযজ্ঞ বন্ধ করেনি দেশটির সেনারা। থেমে নেই অগ্নিসংযোগ ও নিপীড়ন।

এ অবস্থায় জাতিসংঘের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা বিবৃতি দিয়ে বলেছে, রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ বন্ধে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো শুধু গলাবাজি করলে কোনো কাজ হবে না, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিতে হবে ‘সুনির্দষ্টি পদক্ষেপ’।

যুগান্তরের নিউইয়র্ক প্রতিনিধি হাসানুজ্জামান সাকী জানান, মিয়ানমারে চলমান রোহিঙ্গা নির্যাতন ইসু্য নিয়ে নিউইয়র্ক সময় বৃহস্পতিবার দুপুরে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

এতে রোহিঙ্গা নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে এ সমস্যার দ্রুত ও কার্যকর সমাধান চাইতে উদগ্রীব বাংলাদেশ। বৈঠকে মিয়ানমারও বক্তব্য দিতে পারে। বাংলাদেশও মুক্ত বিতর্কে অংশ নেবে। জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশের প্রস্তাব পেশ করবেন।

এর আগে মঙ্গলবার দুপুরে জাতিসংঘ সদর দফতরে নিরাপত্তা পরিষদের রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা পরিষদের উন্মুক্ত বৈঠকের আগে প্রস্তুতিমূলক এ রুদ্ধদ্বার বৈঠকেও রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিষয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে।

বৃহস্পতিবারের বৈঠকের আগে জাতিসংঘে নিযুক্ত ব্রিটিশ উপরাষ্ট্রদূত জোনাথন অ্যালেন বলেছেন, সহিংসতা যাতে বন্ধ হয়, সেজন্য মিয়ানমারকে পরিষ্কার বার্তা দিতে হবে।

রাখাইন রাজ্যে মানবিক সহায়তা অনুমোদন করতে হবে। রোহিঙ্গাদের মর্যাদা নির্ধারণ করতে হবে। ফরাসি রাষ্ট্রদূত ফ্রঁাসোয়া দেলাত্রি বলেছেন, মিয়ানমারের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করতে নিরাপত্তা পরিষদকে কঠোর ও ঐক্যবদ্ধ সদ্ধিান্ত নিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও অন্য চার সদস্য রাষ্ট্রের অনুরোধে আজকের বৈঠকে বসছে নিরাপত্তা পরিষদ।

বৈঠকে মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা সমস্যার সর্বশেষ চিত্র তুলে ধরবেন জাতিসংঘের মহাসচিব আনে্তানিও গুতেরেস।

এ মাসের শুরুতে গুতেরেস মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইসু্যতে নিরাপত্তা পরিষদকে একটি চিঠি লেখেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তা পরিষদ এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর মিয়ানমারে সহিংসতা বন্ধ করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানায়। ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে পাঁচটি প্রস্তাব তুলে ধরেন।

বাংলাদেশ আশা করছে, মহাসচিবের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রগুলো মিয়ানমারে সহিসংসতা বন্ধে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

জানা গেছে, নিরাপত্তা পরিষদের ১৫টি সদস্য রাষ্ট্র মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিষয়ে নিজ নিজ দেশের অবস্থান তুলে ধরবে। জাতিসংঘে কর্মরত একজন বাংলাদেশি কূটনীতিক জানিয়েছেন, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধে এবং তাদের ফিরিয়ে নিতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ আশা করছে বাংলাদেশ।

এজন্য নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে রোহিঙ্গাদের ওপর ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের চিত্রটি তুলে ধরবে বাংলাদেশ।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন যুগান্তরকে জানান, মিয়ানমারের লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ চাপের মধ্যে রয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের আজকের বৈঠকে আমরাও তা তুলে ধরে বক্তব্য দেয়ার যথাসাধ্য চষ্টো করব।

সংশি্লষ্টরা বলছেন, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষমতা আছে নিরাপত্তা পরিষদের। নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব পালন মিয়ানমারের জন্য বাধ্যতামূলক। তবে চীন ও রাশিয়ার মতো স্থায়ী সদস্য কোনো প্রস্তাবে ভেটো দিলে তা বাতিল হয়ে যাবে। তবে এবার অপর তিন স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে বলেই আশা করা হচ্ছে।

গলাবাজিতে কাজ হবে না জাতিসংঘ : জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, রাখাইনে সহিসংতা বন্ধ করে রোহিঙ্গাদের বঁাচাতে মিয়ানমার সরকারকে গলাবাজি বন্ধ করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

মঙ্গলবার কমিশনের এক বিবৃতিতে বলা হয়, Èরোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিপীড়নের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিচারবহিভর্ূত হত্যাযজ্ঞ, মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ, মারধর, ও দুর্বযবহার, যেৌন নিপীড়ন, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, জোর করে ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ এবং ২০০-র বেশি গ্রাম ও হাজার হাজার ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয়া।

রোহিঙ্গারা কেন গণহারে দেশ ছাড়ছে, তা নিয়ে অং সান সুচির হাস্যকর মন্তব্যের সমালোচনা করে জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘কেউ ইচ্ছা করে, বিশেষ করে হাজার হাজার মানুষ, তাদের ঘরবাড়ি ও পিতৃভূমি ছেড়ে যেতে চায় না। জীবন হুমকির মধ্যে না পড়লে কেউ খুব খারাপ অবস্থার মধ্যে থাকলেও নিজ দেশ ছেড়ে অজানা গন্তব্যে গিয়ে প্লাস্টিকের শিটের মধ্যে বাস করতে চায় না।’

জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন সুচিকে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের আহ্বান জানান। দেড় বছরের বেশি সময় আগে সুচি দায়িত্ব নিলেও আজ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে দেখা করেননি। অথচ এর মধ্যে দুই দফায় রাখাইনে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে।

কমিশনের বিবৃতিতে বলা হয়, রাখাইনে রোহিঙ্গা নিধন বন্ধে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোকে শুধু বিবৃতি না দিয়ে সুনির্দষ্টি পদক্ষেপ নিতে হবে।

একযোগে কাজ কাজ করবে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা : গে্লাব অ্যান্ড মেইল পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের ক্ষমতাধর সেনাবাহিনীর ওপর চাপ তীব্রতর করতে একযোগে কাজ করার জন্য আলোচনা শুরু করেছে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র। দুটি দেশ চাচ্ছে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন বন্ধ করতে।

কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড সোমবার রাতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেছেন।  তারা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওপর চাপ বৃদ্ধির বিষয় নিয়ে কথা বলেন।

কিন্তু তাদের মধ্যে সুনির্দষ্টি কোনো পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়নি।  ফ্রিল্যান্ড কানাডার হাউস অব কমন্সে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে এক জরুরি বিতর্কে এ তথ্য জানান।

ফ্রিল্যান্ড বলেছেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য না হলেও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কানাডার রয়েছে ব্যাপক প্রভাব।

ফ্রিল্যান্ড বলেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে, জাতিগত নিধনে তাদের ভূমিকা বিশ্ব দেখছে এবং আমরা নীরব দাঁড়িয়ে থাকব না।

রক্ষণশীল দলের এমপি গার্নেট জিনিয়াস এ জরুরি বৈঠকের অনুরোধ করেন। তার এক প্রশ্নের উত্তরে ফ্রিল্যান্ড বলেন, কানাডা সরকার মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কর্তাদের ওপর সরাসরি চাপ দিচ্ছে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটে কানাডা সরকার তিনটি লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে- জাতিগত নিধন বন্ধ করা, তাদের কাছে মানবিক সাহায্য পৌঁছানো নিশ্চিত করা এবং রোহিঙ্গারা যাতে রাখাইনে ফিরে গিয়ে নির্ভয়ে বাস করতে পারেন সেটা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে একযোগে কাজ করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.