সভ্যতার আলো

সভ্যতার আলো, তার লিখনী দিয়ে আরো উন্নত ও সমৃদ্ধশালী সভ্য জাতি গঠনে অনন্য ভূমিকা রাখবে

যে সত্য জানা হলো না!

 

দৌলতদিয়া ঘাটে যখন পৌঁছলাম, তখন অভিজ্ঞতার সূর্য মধ্য আকাশে। ঢাকা থেকে একক যাত্রা। উদ্দেশ্য সহজ। এনজিওদের পক্ষে কিছু উন্নয়নমূলক কাজ করা। অভিজ্ঞতার ঝুলিতে কিছু নেই বললেই চলে।

সুইজারল্যান্ড রেডক্রসের পক্ষ থেকে এইচআইভি এইডস পজিটিভ হোল্ডারদের সমস্যাগুলো জানা, সেই সব তৎকালীন সরকারকে জানানো আর বাংলাদেশ রেড ক্রস ও স্থানীয় এনজিওদের সাথে সমন্বয় করে একটা কাজ শুরু করে দিয়ে যাওয়াই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য। নিজের মনের ক্ষীণ আশা ছিলো যদি সুযোগ থাকে তাদের মৌলিক অধিকার কি কি লঙ্ঘন হচ্ছে সেটা জেনে নিয়ে কিছু একটা করা।

গনগনে দুপুরে ঘাটে নেমে সেখানে পৌঁছবার জন্য পথে একে ওকে যৌনপল্লীতে যাবার সঠিক পথটি কোন দিকে জিজ্ঞাসা করতেই কারো কারো চিকন চাহনি আর রহস্যময় হাসিমিশ্রিত মুখ দেখে বিব্রত – বিরক্ত বা বিস্মিত হইনি। এসব কিছুর প্রস্তুতি নিয়েই আমার সেখানে যাওয়া। আবার কারো তাকানোতে নব্য আনন্দের ঝিলিকও দেখেছি। যত প্রস্তুতিই থাক, সেখানে পৌঁছে যাবার পর সেই বয়সে একটুও কি থমকে যাইনি? গিয়েছিলাম!

স্যাতস্যাতে বসতিতে যত না প্রাপ্তবয়স্ক নারী যৌনকর্মী তার চেয়ে বেশি কিশোরী-সদ্য তরুণী। দু-চারজন মধ্যবয়ষ্ক। বেশ কিছু সংখ্যক পুরুষ। যাদের যৌনপল্লী নিয়ন্ত্রক বা কর্তা ব্যক্তি বলেই মনে হলো। প্রথমে তাদের কাছেই আমার পরিচয়, আসার উদ্দেশ্য খোলসা করে বলতে হলো। কারণ সরকারি পর্যায় থেকে স্থানীয় প্রশাসনকে জানাবার পরও ওই এলাকার দণ্ডমুণ্ডের কর্তাব্যক্তি তো তারাই। আমার ভিজিটিং কার্ডের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তারা একচিলতে উঠোনের এক কোনে মাদুর পেতে আমাকে বসতে দিলো।

মুরুব্বি শ্রেনীর সুস্বাস্থ্যের অধিকারী পানখাদক দুই চারজন তাদের ঘরানার নারীদেরকে ডাকলেন। তাদের কাছে আমার দ্বিতীয় দফার ইন্টারভিউ এর সময় এক ভদ্রমহিলা আমাকে প্রশ্ন করে বসলেন, “ তা আপনার তো বিয়ে হবে না। আপনি খারাপ পাড়ায় আইছেন। “ কত বাস্তব প্রশ্ন আজ বুঝি। আমরা যারা কাজের প্রতি পরম ভালোবাসা নিয়ে এসব ঝুঁকির সাথে দিনরাত মোকাবিলা করি আসলেই আমরা জানি প্রশ্নটির গভীরতা।  

সেই ভদ্র মহিলাদেরকে আবার আমাকে আসার উদ্দেশ্য, কাজ এর বিষয়ে সবিস্তারে বলার পর তারা অসংখ্য প্রশ্ন করলেন যার সব উত্তর আমার দেয়া সম্ভব ছিলো না বা যা দিয়েছিলাম সেই সব আজ আর বলাও যাবে না।

 ভ্রমণ পথে পানিটুকুও খাওয়া হয়নি এই কথা মনে পড়াতেই পিপাসা বেড়ে গেল। ওদের কাছে পানি চাইতেই উপস্থিত নারী পুরুষ মুখ চাওয়া চাওয়ি করলেন। বুঝলাম ইতস্তত বোধ করছেন। দুই চারজন শিশু যে কোন সময়ে আমার ঠিক পিছনেই নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিলো সেটা টের পেলাম অবোধ এক শিশু যখন আমাকে প্রশ্ন করে বসলো, “তুমি কি আমাদের গেলাসে পানি খাবা?” চমকে পিছনে তাকিয়ে দেখলাম আমাদের আগামি- যারা এই ছোট্ট বয়সে জেনে গিয়েছে “আমরা” আর “তোমরা”।

এরপর একে একে ভিড় বাড়তে লাগলো। সারারাত জেগে থাকা সদ্য ঘুম থেকে জেগে ওঠা নারী। অনেক পুরুষের শরীরের ক্লান্তি দূর করা ক্লান্ত নারীকূল। কেউ দাত ব্রাশ করতে করতে সেই উঠোন বৈঠকে কি কথা হচ্ছে- সেই শুনতে দাঁড়িয়ে গ্যালো, কেউবা কাপড় হাতে গোসল করতে যাবার আগে হঠাৎ অচেনা একজনকে দেখে দাঁড়িয়েছে। কেউ বা ঘাটের হাটে যাবে বাজার সওদা করতে। কারো মুখে বিস্ময়। কেউ বিরক্ত। কারো বা চোখে সন্দেহ !!!

বছর তিরিশের এক যুবক আলোচনা জমে উঠতে না উঠতেই আমাকে একটু আড়ালে ডেকে নিয়ে গ্যালো। বোঝার চেষ্টা– আমার আসল মতলব কি? এত মিঠা মিঠা কথা ক্যানো? তাদেরকে দেখিয়ে আসলে আমি কত টাকা ফায়দা লুটে নেবো? তাকে কত ভাগ দেবো???

এই রকম বৈরী আবহাওয়ার মাঝ দিয়েই কাজ শুরু করেছিলাম দৌলতদিয়া ঘাটের যৌন পল্লীর একঝাঁক মানুষের সাথে। যে স্মৃতি আজো আমার হ্রদ মাঝারে আমার সাথেই লেগে আছে। আমার বেদনাদায়ক ভালোলাগা।

সেদিন আবার যখন ফিরে এলাম সেই উঠোন বৈঠকে তখন বেলা মন্দ না। ওদের সকলেরই খাবার সময় পার হয়ে যাচ্ছে। তারাও উসখুশ করছে। আমিও প্রচণ্ড ক্ষুধারত, কিন্তু কাকে বলবো সেটা? কে খাওয়াবে। কোথায় খেতে যাবো? আমি কিনে খেলে তারা মনে কষ্ট পাবে। আমার ঝোলার মাঝে যেসব শুকনা খাবার আছে, সেটা বের করা সম্ভব না তাহলে ভেদাভেদটা আরো স্পষ্ট হবে। তাহলে উপায়???

ব্যবস্থা সেই যুবকই করে দিলো। এক অপরূপ লাবন্যময়ী (বছর ১৭/১৮ হবে হয়তো) একটি মেয়েকে নিরদেশ দিলো আমার খাবারের আয়োজন করতে। ভেঙে গেল সভা। বিকালে আবার দ্যাখা হবে এই কথার পর যে যার মত ঘরে চলে গ্যালো, আমি গেলাম সেই মেয়েটির সাথে একটা ছোট্ট খুপড়িতে। একজনের পক্ষে বসা বা শোওয়াই কষ্টের তার উপরে আমি এক বিশাল বোঝা। ভ্যাপসা গরম– আলো-বাতাসহীন মাটির স্যাঁতস্যাঁতে খুপড়ি যেন আমার একমাত্র ভরসা বলেই মনে হলো।

বিকালটা আর তেমন বসা হলো না। যতটুকু কথা হলো তার মাঝে আমি থাকবো কয়দিন? খাবো কি? এসব নিয়েই বেশি প্রশ্ন আসল কাজের প্রতি কারো তেমন মনোযোগ তখনো আকর্ষণ করতে পারিনি। সেটা আশাও করিনি। তাদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে না পারলে কাজ করবো কি? আমি তাদের সাথেই সময় কাটাতে চাই এই ইচ্ছা তাদেরকে জানাতেই আবারো একে অপরের দিকে তাকাতাকি। খুব স্বাভাবিক। কার ভালো লাগে এই উটকো ঝামেলা? ওদের নিত্যদিনের জীবনযাপনের ব্যাঘাত ঘটানো!!! তারপরও সেই পেশাদার নেতা গোছের ছেলেটাই বরাদ্দ ও বন্দোবস্ত করে দিলো সেই লাবন্যলতার ঘরটিই আমার অস্থায়ী ঠিকানা।

সন্ধ্যে হবার আগেই সব তোড়জোর শুরু হয়ে গ্যালো। কেউ আমাকে পরামর্শ  দিলো  লুকিয়ে পড়তে। কেউ বা কিছুটা সময় শহরের দিকে চলে যেতে। আমার নিজস্ব কিছু ভাবার বা বলার কিছু ছিলো না। ওদের এলাকা ওদের মতই চলতে হবে। আমার আশ্রয়দাতা মেয়েটি মুরুব্বি শ্রেণীর এক মহিলাকে জানিয়ে দিলো, আজ সে কোন কাজ করবে না তার ঘরে যেন কাউকে না পাঠানো হয়। তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠা মাঝ বয়সী ভদ্র মহিলা একটু পর ঠান্ডা হয়ে গ্যালো, যখন বুঝলো তার আজকের বরাদ্দ বন্ধ থাকবে না। এমনকি সেই নেতা শ্রেণীর যুবক ও খুশি বরাদ্দের ঘাটতি নয়, বরং বাড়তি পাওনা পাবে।

কিছুটা ইতস্তত সেই লাবণ্যলতা ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলো তার মাটির মেঝেতে বিছানো একটা মোটা কাঁথার উপর ধূলিমলিন চাদর পরিবর্তন করার জন্য। আমার শোবার বালিশ নিয়েও তার চিন্তা এই রকম হাজারো চিন্তার মাঝে তার একটা আত্মতৃপ্তিমূলক হাসি আমি দেখলাম যে, “আজ তার কাজ নাই।” আহ কি না পরম শান্তি সেদিন মেয়েটি অনুভব করেছিলো !!!

পাশে বসে গল্প করতে করতে দেখলাম পুইশাক কেবল হাত দিয়েই কত দ্রুত রান্নার উপযুক্ত করে ফেলা যায়। কত দ্রুত চাল, ডাল আর পুইশাক মিশিয়েই অসাধারণ সুস্বাদু খিচুড়ি রান্না হয়। গরম গরম সেই খাবারের সাথে বিনয়, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা থাকলে খেতে কত মজাই না লাগে !

ঘর থেকে তো আর বের হওয়াই যাবে না যতক্ষণ না পরযন্ত সব “ক্লায়েন্ট” বিদায় না নেবে বা যার যার ঘরে ঢুকে পড়বে। তাই গল্পই সম্বল আমার। কথা বলতে বলতে জানতে ইচ্ছে হলো, কিভাবে এখানে এলো এই অপরূপ লাবণ্যময়ী মেয়েটি?, কেমন কাটে তার সময়?,  কেমন আয় হয়, কেমনইবা খরচ? এইরকম কথার একটু সুর ধরিয়ে দিতেই মেয়েটি গরগর করে বলে দিতে লাগলো এতদিন ধরে জমিয়ে রাখা তার না বলা কথা।

অনুজ্জ্বল আলোয় তার মুখের আভা ছোট্ট এই ঘরটাকে আলোকময় করে দিতে থাকলো। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনলাম কেবল মা মারা যাওয়াতেই এই মেয়েটির বাবা তার দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করে এই ঘাটে বেচে দিয়েছে। বাবা ??? বাবা !!!

এই ঘাটের কেনা-ব্যাচা বেশ অন্যরকম। যে কেউ ইচ্ছে করলেই এখানে এসে ব্যবসা ফেঁদে বসতে পারবেন না। তার জন্যে তাকে শক্ত সমর্থ নেতা গোছের কাউকে বিয়ে করতে হবে। যার কোন দলিল থাকবে না, কিন্তু সকলেই জানবে এর মালিক কে। এই রকম একেকটা শক্ত সমর্থ পুরুষের অধীনে অনেক যৌনকর্মী আছেন যাদের ক্ষমতা নাই তার স্বামীর (?) কথার বাইরে যাওয়ার। এই মেয়েটির পল্লী স্বামী সেই নেতা গোছের ছেলেটি। তার মুখেই শুনছিলাম বৈধ পল্লী হবার পর ও পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় নেতা, মাতবরদেরকে “মাসিক বখরা” দেবার কথা। এমনকি মাঝে মাঝে তাদেরকেও মনোরঞ্জন করতে হয় বৈকি! মেয়েছেলের শরীর গণিমতেরই তো মাল!

অদ্ভুত স্বাধীনতা! তিনদিন থাকলাম এক অন্যরকম জগতে। সেখানে কিছু বেসরকারি সংস্থা কাজ করে শিক্ষা–স্বাস্থ্য নিয়ে। যদিও সেখানে নিরাপদ যৌনাচরণের কোন বালাই নেই। গর্ভনিরোধের ব্যবস্থা থাকলেও ব্যবহার নেই। নেই নিরাপদ খাবার পানি। পয়ঃনিষ্কাষণ ব্যবস্থা। নেই পেটের ক্ষুধা মেটাবার জন্য শরীর বেচাকেনা ছাড়া আর কোন বিনোদন। ওরা তখনো কেউ ভোট দেবার অধিকার অর্জন করেনি। ওদের শবের সৎকার হয় নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে। ওদের নিজস্ব কোন ধর্মাচরনের ব্যবস্থা নেই। কিছুই না থাকার পরও ফি বছর জনসংখ্যা ব্রদ্ধির সব ব্যবস্থাই আছে।

আজ জানি না তাদের অগ্রগতি কতটুকু, তবে শুনেছি আজ তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র আছে, তাদের ধর্ম পালনের ব্যবস্থা আছে, তাদের মাঝে কেউ মারা গেলে যার যার ধর্ম মতেই সৎকার হয়, তারা ধর্মীয় উৎসব পালন করেন, মায়ের নাম সব জায়গায় থাকতেই হবে এই নিয়ম করায় অনেকেই সুবিধাবোধ করছেন। আমাদের সেদিনের সেই প্রতিবেদন আসলেই সরকার মহলের কেউ পড়েছিলো কিনা জানি না। তবে আজ যখন শুনি, খোঁজ পাই দিন বদলেছে তাদের যা আসলে আমরা চেয়েছিলাম তখন ভালো লাগে। ভীষণ ভালো লাগে, আরো ভালো লাগতো যদি শুনতাম তারা সকলেই “মুক্ত – স্বাধীন – বন্ধনহীন”। যা হবার নয়।

আজো সেই অপরূপা মেয়েটিকে খুঁজি। যার সাথে তিন দিন তিন রাত কেটেছে। যে মা হতে চেয়েছিলো। সংসার চেয়েছিলো। স্বামী সে যত গরিবই হোক, তাকেই মেনে নিতে চেয়েছিলো। কিছু টাকা জমিয়ে তার পল্লী স্বামীকে বিদায় দিয়ে ভিন গ্রামে চলে যেতে চেয়েছিলো। কি জানি তার স্বপ্ন অপূরণই রয়ে গ্যালো কিনা? নাকি সে আজ বুঝি সে কয়েক বাচ্চার মা। যাদের পরিচয় কেবল ওই পল্লী অথবা মা হতে গিয়ে মারা গিয়েছে মেয়েটি? কি জানি!!!

দিলরুবা শরমিন: আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published.