সভ্যতার আলো

সভ্যতার আলো, তার লিখনী দিয়ে আরো উন্নত ও সমৃদ্ধশালী সভ্য জাতি গঠনে অনন্য ভূমিকা রাখবে

পাউরুটিতে অসহনীয় মাত্রায় লবণ

নিউজ ডেস্ক : দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ১০টি ব্র্যান্ডের পাউরুটির অধিকাংশের নমুনায় অসহনীয় মাত্রার লবণ পাওয়া গেছে। বেশি লবণ খাওয়া ক্ষতিকর জেনেও মানুষ তা খাচ্ছে। এছাড়া ঢাকা শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষের খাবারে লবণ গ্রহণের পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত নিরাপদ লবণের মাত্রার চেয়ে বেশি। খাবারে নিরাপদ মাত্রার চেয়ে বেশি লবণ গ্রহণ হৃদরোগের অন্যতম কারণ।
সোমবার (১৫ মে) সকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) শহীদ ডা. মিলন হলে পাউরুটিতে লবণের মাত্রা ও খাদ্যদ্রব্যে অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার প্রবণতা নিয়ে নিয়ে প্রকাশিত দুটি গবেষণা থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
বিএসএমএমইউতে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব গবেশণা প্রকাশ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ এন্ড ইনফরমেটিক বিভাগের (Department of Public Health and Informatics (DPHI) উদ্যোগে এসব গবেষণা পরিচালিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআর, বি-এর শেয়ার প্রকল্পের যৌথ উদ্যোগে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
পাউরুটিতে লবণের মাত্রা নিয়ে ‘সোডিয়াম কনটন্টে অফ ব্রান্ডেড ব্রেডস এ্যাভাইলাবল ইন দি মার্কেট অফ ঢাকা সিটি, বাংলাদেশ’ র্শীষক গবষেণাটি করেছেন বিএসএমএমইউ’র শিক্ষার্থী ডা. মোহাম্মদ রাশদিুল আলম।
খাদ্যদ্রব্যে অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার প্রবণতা নিয়ে নিয়ে ‘ডাইয়েটারি সল্ট ইনটকে ইন আরবান পপুলশেন লিভিং ইন এ স্লাম অফ ঢাকা, বাংলাদেশ’ শীর্ষক বৈজ্ঞানিক গবষেণাটি করেছেন বিএসএমএমইউ’র শিক্ষার্থী ডা. ফাহমিদা আফরোজ খান।
সেমিনারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান।
সেমিনারে জানানো হয়, বাজারে বিক্রি হওয়া ১০টি ব্র্যান্ডের পাউরুটির অধিকাংশের নমুনায় সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি লবণ পাওয়া গেছে। বেশি লবণ খাওয়া ক্ষতিকর জেনেও মানুষ তা খাচ্ছে। গবেষকেরা বলেছেন, তৈরি খাবারে কী পরিমাই লবণ আছে তা মানুষকে জানানো দরকার।
গবেষকেরা বলেছেন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত লবণ উচ্চরক্তচাপের কারণ। উচ্চরক্তচাপের হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। দেশে অন্যান্য অসংক্রামক রোগের সঙ্গে হৃদরোগের প্রকোপ ও এই রোগে মৃত্যুর হার বাড়ছে। বাংলাদেশে ১৫ শতাংশ মানুষ উচ্চরক্তচাপে ভুগছে। আর ৫৯ শতাংশ মৃত্যুর কারণ অসংক্রামক ব্যাধি।
গবেষক মোহাম্মদ রাশেদুল আলম ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬০টি খুচরা দোকান থেকে ১০টি ব্র্যান্ডের পাউরুটির নমুনা নিয়ে লবণের মাত্রা মেপেছেন। এতে দেখা গেছে, সাতটি ব্র্যান্ডের পাউরুটিতে লবণের পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ১০০ প্রাম পাউরুটিতে লবণের সহনীয় পরিমাণ সর্বোচ্চ ৪৫০ মিলিগ্রাম আর সংগৃহীত পাউরুটির নমুনায় লবণ পাওয়া গেছে প্রতি ১০০ গ্রামে গড়ে ৫০৩ মিলিগ্রাম। তিনটি নমুনায় লবণ পাওয়া গেছে, ১০০ গ্রামে ৪৫০ মিলিগ্রামের কম। একটি নমুনায় পাওয়া গেছে ৩১৪ মিলিগ্রাম। এটি সবচেয়ে কম। একটিতে পাওয়া গেছে ৬২৫.৮৫ মিলিগ্রাম। এটি সবচেয়ে বেশি।
বিএসএমএমইউ’র শিক্ষার্থী ও গবেষক মোহাম্মদ রাশেদুল আলম জানান, পাউরুটির মোড়কে লবণের পরিমাণ লিখে দেওয়া উচিত। এতে মানুষ লবণের মাত্রা জানতে পারবেন এবং সচেতন মানুষ উচ্চরক্তচাপ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারবেন।
রাজধানীর বাউনিয়া এলাকার বস্তিবাসীদের লবণ খাওয়ার প্রবণতা নিয়ে করা গবেষণার গবেষক বিএসএমএমইউ’র শিক্ষার্থী ডা. ফাহমিদা আফরোজ খান প্রাপ্তবয়স্ক ১০০ নারী ও পুরুষকে নিয়ে গবেষণা করেছেন। এদের মধ্যে ৬১ জন নারী ও ৩৯ জন পুরুষ। গবেষণায় দেখা গেছে, এদের ৮২ জন জানেন মাত্রাতিরিক্ত লবণ খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু এদের ২৪ ঘণ্টার প্রস্রাবের নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এরা প্রত্যেকই গ্রহণযোগ্য পরিমাণের চেয়ে বেশি লবণ খান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, একজন মানুষ দৈনিক ৫ গ্রাম লবণ খেতে পারে। এই পরিমাণ লবণ স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। কিন্তু ফাহমিদা আফরোজ খান তাঁর গবেষণায় দেখেছেন, এরা দৈনিক গড়ে ৭.৮৯ গ্রাম লবন খান।
সেমিনারে আরও জানানো হয়, মানুষের প্রতিদিনকার খাবারের অন্যতম নাম লবণ। খাবারকে সু-স্বাদু রূপ দেয় এই লবণ। অথচ অতরিক্তি লবণ খাওয়ার কারণে দেশের মানুষের মধ্যে বাড়ছে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি। দেশের অধিকাংশ মানুষের মধ্যইে লবণ খাওয়ার প্রবণতা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। আর তাই দেশে প্রতিদিনই উচ্চ রক্তচাপসহ হৃদরোগরে ঝুঁকি বাড়ছে।
বিশষেজ্ঞরা বলছেন, মাত্রারক্তি লবণ খাওয়ার কারণে দেশে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগসহ অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। এক্ষত্রে সচতেনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবষেণায় দেখা গেছে, দেশের মানুষ প্রতিদিন ৭ দশমকি ৮ গ্রাম লবণ খাচ্ছে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, এই পরিমাণ কোনোভাবেই ৫ গ্রামের বেশি হবে না। এক্ষেত্রে নারীদরে মধ্যে লবণ খাওয়ার প্রবণতা পুরুষের চেয়ে বেশি বলেও গবষেণায় উঠে এসেছে। গবেষেণায় দেখা গেছে, নারীদরে শরীরে পটাশিয়ামের চেয়ে ক্ষতিকর সোডিয়ামের পরমিাণ অনকে বেশি। সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের অনুপাত হলো- ৫ ও ২। অপরদিকে পুরুষের ৪ ও ৬।
এছাড়া গবষেণায় উঠে এসেছে মানুষরে মধ্যে দোকান থেকে বিভিন্ন ব্রান্ডের ব্রেড ক্রয়ের চাহিদা বেড়েছে। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বিক্রি হওয়া ১০টি ব্রান্ডের ব্রেড ল্যাবে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ৭ টিতেই অতিরিক্ত লবণ দেয়া হচ্ছে। যা বুঝে হোক, না বুঝে হোক প্রতিনিয়ত দেশের মানুষ বেশি লবণ খাচ্ছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ এন্ড ইনফরমিটিকস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. খালেকুজ্জামান জানান, মানুষের শরীরে সোডিয়মের পরিমাণ বেশি হলে উচ্চ রক্তচাপের সৃষ্টি হয়। দেশে নারীদের মধ্যে লবণ খাওয়ার প্রবণতা বেশি। যে কারণে তারা উচ্চ রক্তচাপে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। অথচ অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার কারণে বাড়ছে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএসএমএমইউ’র উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল্লাহ সিকদার, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী আসগর মোড়ল।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বিএসএমএমইউ’র পাবলিক হেলথ এন্ড ইনফরমেটিক বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ শরীফুল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য রাখেন পাবলিক হেলথ এন্ড ইনফরমেটিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মোঃ খালেকুজ্জামান।
সেমিনারের দ্বিতীয় পর্বে ছিল বৈজ্ঞানিক অধিবেশন। বৈজ্ঞানিক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন আইসিডিডিআর,বি-এর বিজ্ঞানী ও প্রকল্প পরিচালক ড. ইকবাল আনোয়ার। মডারেটরের দায়িত্ব পালন করেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO)-এর উপদেষ্টা (গবেষণা ও প্রকাশনা) ড. এম মোস্তফা জামান। প্যানেলিস্ট হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল জলিল চৌধুরী, অধ্যাপক ডা. মো. হারিসুল হক ও নাগরিক টিভির চীফ অপারেটিং অফিসার ড. আব্দুন নূর তুষার।
‘কারেন্ট এভিডেন্স অন সল্ট ইনটেক এ্যাস রিচ ফ্যাক্টর ফর এনসিডি (নন কমিউনিকেবল ডিজিজেস)’ শীর্ষক বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক সোহেল রেজা চৌধুরী।
সেমিনারে সরকারি-বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ, উন্নয়ন সহযোগী, প্রাইভেট সেক্টর, স্বাস্থ্য গবেষক, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক, নীতি নির্ধারক, গণমাধ্যম থেকে আগত প্রতিনিধিবৃন্দ অংশ নেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.